Saturday, February 17, 2018

লিখেছেনঃ তোফায়েল আজম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র ও অ্যালামনাইদের কাছে অন্যতম শ্রদ্ধার নাম কাজী মোতাহার হোসেন স্যার। বাংলাদেশে পরিসংখ্যানের ভিত্তি স্থাপন থেকে শুরু করে পরিসংখ্যানে গবেষনার প্রবাদ পুরুষ হিসেবেই তাকে সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখি।

বাংলাদেশে পরিসংখ্যানের প্রবর্তক মোতাহার হোসেন স্যারের সাথে আধুনিক পরিসংখ্যান বিদ্যার জনক রোনাল্ড ফিশার এর অদ্ভুত মিল। দুইজনই মারাত্মক ব্রিলিয়ান্ট। এতে কোন সন্দেহ কখনো কেউ প্রকাশ করতে পারেনি। অল্প বয়েস থেকেই দুজনই গাণিতিক দৃষ্টির ব্রিলিয়ান্ট ছিলেন।

☛ আরও পড়ুনঃ
রাশিবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান ও কাজী মোতাহার হোসেন

রোনাল্ড ফিশার 

দুজনের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো মিল ছিল- দুজনই পদার্থবিজ্ঞানের লোক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন স্যার আর ক্যাম্ব্রিজের এস্ট্রনমির গ্র্যাজুয়েট ছিলেন আর এ ফিশার (১৮৯০-১৯৬২) । পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার সময়টায় দুজনই সংখ্যা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ফিশার মশাই উনার জীবনের প্রথম যে পেপার পাবলিশ করেন সেটা স্বাভাবিক ভাবেই ছিল আধুনিক পরিসংখ্যানের জন্য অন্যতম ধাপ- Method of maximum likelihood।

Fisher এরপর কাজ করতে থাকেন W. S. Gosset এর সাথে। বিষয়- Equation of Standard Deviation। এই গবেষণা করতে গিয়েই তিনি Sample mean আর Population mean এর মাঝে দৃশ্যমান পার্থক্যকে গানিতিক ও গঠনমুলক রুপ দান করেন। পরিসংখ্যানের বাস্তব ব্যাবহার নিয়ে এরপর কাজ করতে থাকেন মুলত ছোট ছোট Sample নিয়ে। তখন তিনি Degrees of freedom এর সঙ্গায়ন করেন এবং আরো গভীর গবেষণায় হাত দেন।

ফিশার ব্যক্তিগত ভাবে মারাত্মক গোঁয়ার আর কাজের বেলায় ছিলেন পারফেকশনিস্ট। ভুল করার অপছন্দ থেকেই আরো জোরেসোরে কাজ শুরু করেন সংখ্যান নানান দিক নিয়ে।

১৯১৪ সালে আর্মিতে যোগ দেয়ার জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই দৃষ্টিত্রুটিতে ভোগা ফিশার আর্মি থেকে রিজেক্টেড হবার পর হাই স্কুলে অংক ও পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে পড়ানো শুরু করার সময় পরিসংখ্যানে চালিয়ে যাওয়া কাজ তখনকার সময়ের বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ কার্ল পিয়ারসনের নজরে আসেন। ১৯১৭ সালে পিয়ারসন পেপার পাবলিশ করেন ফিশারের কাজের উপর। মূলত ফিশারের method of maximum likelihood এর সমালোচনা সম্বলিত। অল্প নাম ওয়ালা ফিশার বিখ্যাত পিয়ারসনের সমালোচনার জবাব দেন কিন্তু পিয়ারসন তাতে তেমন গা না দিয়ে ফিশারের পরবর্তী অনেক থিওরী ও গবেষণাকে প্রত্যাখ্যান করেন।

সেই সময়টায় ফিশার সংখ্যার এই জগতটায় বাচ্চা, কিন্তু পিয়ারসন স্বনামধন্য। পিয়ারসনের প্রভাবে রয়েল সোসাইটি থেকে ফিশারের প্রায় সব পেপার সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু পারফেকশনিস্ট ফিশার তাঁর গবেষনা চালিয়ে যান, এবং তার তত্ত্বের পক্ষে প্রমাণ দেন। পিয়ারসন যদিও পরবর্তীতে ফিশারকে তার সাথে কাজ করার জন্য চাকরী অফার করেন, কিন্তু গোঁয়ার ফিশার পিয়ারসনের আগের বিরোধীতার জের ধরে আর সেই চাকরীতে যোগ দেননি! (পরিসংখ্যানের দুই রাইভাল!)

ফিশার তখন পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেন Rothamsted Experimental Station-এ। কাজ করেন কৃষি বিষয়ক গবেষণা নিয়ে এবং Analysis of variance তত্ত্ব দেন এবং কৃষি বিষয়ক গবেষনার ফলাফল হিসেবেই পরবর্তিতে আমরা পাই তার বিখ্যাত Statistical Methods for Research Workers।

১৯১৭তে বিবাহ এবং সংসারী জীবন যাপন করতে থাকা ফিশার পরবর্তীতে কাজ করেন Natural selection and population genetics নিয়ে এবং লিখেন Genetical Theory of Natural Selection। এই বইটায় অবশ্য উনার প্রিয়তমা পত্নি Ruth Eileen লিখতে সাহায্য করেন।

Rothamsted এ কাজ করার সময় ম্যাক্সিমাম লাইকলিহুড এবং সাইন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট থেকে ছোট স্যাম্পল নেবার প্রসেসের উপর আরো দুইখানা গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখান থেকেই sample statistic আর population values এর ধারনা স্পষ্ট হতে থাকে। এই দুই পেপার থেকেই বাকি গবেষকেরা নানান ধরনের variations আর প্রিসাইজ এস্টিমেশনের ধরনা পেতে থাকেন।

পিয়ারসন রিটায়ার্ড করার পরে যদিও ফিশার কেম্ব্রিজের চাকরীটা গ্রহন করেন, কিন্তু যুদ্ধটা চলতেই থাকে। এর প্রভাব কেম্ব্রিজ পরিসংখ্যান বিভাগেও পড়ে বৈকি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গবেষণায় বেঘাত ঘটলেও পরবর্তিতে তিনি গবেষণা চালিয়ে যান পরিসংখ্যানের নানান দিক নিয়ে।

সারা জীবনে একটার পর একটা ফেলোশীপ, Iowa state university তে শিক্ষকতা, রয়েল স্ট্যাটিস্টিক্স সোসাইটি থেকে তিনটা মেডেল, ডারউইন মেডেল, কোপলে মেডেল, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান্সূচক ডিগ্রী, ২০টার অধিক ইন্সটিটিট ও একাডেমির সম্মানসূচক সদস্য ১৯৫২ সালে কুইন এলিজাবেথ থেকে নাইট ব্যাচেলর উপাধী গ্রহণ করেন।

ফিশারের গোঁয়ার্তুমি আর পারফেকশনিস্ট আচরণের জন্য আজকের পরিসংখ্যানের এই আধুনিক রূপ। পরবর্তীতে অনেকেই ফিশারের গবেষণার উপর এবং তাঁর দেখানো পথে অভুতপূর্ব কাজ করেছেন। ফিশার পরবর্তী পরিসংখ্যানে তাঁর অভূতপূর্ব অবদানের জন্যই তাঁকে আধুনিক গবেষণার জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। :)

আজ এই গোঁয়ার লোকটার জন্মদিন। আমাদের সকল কষ্টের(!) জনক এই পদার্থবিদ পরিসংখ্যানের জনককে শুভ জন্মদিন! :)

তথ্যসূত্রঃ 
১। http://mnstats.morris.umn.edu/intro…/history/…/RAFisher.html
২। https://en.wikipedia.org/wiki/Ronald_Fisher

লেখকঃ টিচিং অ্যাসিস্টেন্ট ও পিএইচডি শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকি। লেখকের সব লেখা এখানে
Category: articles

Monday, September 25, 2017

আজ ২৫ সেপ্টেম্বর। ১৮৯৩ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন সুইডিশ গণিত ও পরিসংখ্যানবিদ হ্যারাল্ড ক্র্যামার। গাণিতিক পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনাভিত্তিক সংখ্যা তত্ত্বের একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনি। ব্রিটিশ গণিতবিদ জন কিংম্যান এর মতে,
 হ্যারাল্ড ক্র্যামার হলেন পরিসংখ্যানিক তত্ত্বের অন্যতম দৈত্য। 
হ্যারাল্ড ক্র্যামার 

জন্ম সুইডেনের স্টোকহোমে। জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে এই শহরের আশেপাশেই। ১৯১২ সালে ভর্তি হন স্টোকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়েন গণিত ও রসায়ন নিয়ে। ল্যাবের অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে টেনে আনে গণিতের দিকে। শেষ পর্যন্ত একই বিশ্ববিদ্যালয়ে মারসেল রিয়েজ এর অধীনে ডক্টরেট শুরু। এ সময় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জি এইচ হার্ডির দ্বারাও। এই সেই হার্ডি, যিনি বিখ্যাত ভারতীয় গণিতবিদ রামানুজানের প্রতিভা প্রচার ও প্রকাশেও ভূমিকা রেখেছিলেন। যাই হোক, এ দুজনের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯১৭ সালে ক্র্যামার ডিরিকলেট ধারার ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

পিএইচডি লাভ করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে থাকেন ১৯২৯ সাল পর্যন্ত। এ সময়ের শুরুর দিকে তিনি অ্যানালিটিক নাম্বার থিওরি (সংখ্যা তত্ত্ব) নিয়ে প্রচুর কাজ করেন। এছাড়াও তিনি মৌলিক সংখ্যা (Prime number) ও যমজ মৌলিক সংখ্যার বিন্যাস নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৩৬ সালে এ বিষয়ে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেপারখানা প্রকাশিত হয়।$^{[1]}$ এখানে তিনি সংখ্যা তত্ত্বে সম্ভাবনার (Probability) ভূমিকার বিবরণ দেন। এছাড়াও দেন প্রাইম গ্যাপ বা মৌলিক সংখ্যার ব্যবধানের (Prime gap) একটি হিসাব। এটি পরে ক্র্যামার কনজেকচার নামে পরিচিত হয়।

সম্ভাবনা তত্ত্বের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন ১৯২০ এর দশকে। সে সময় এই ক্ষেত্রটিকে গণিতের শাখা মনে করা হত না। ক্র্যামার এটা মানতে পারলেন না। ১৯২৬ সালের এক পেপারে তিনি লেখেন,
সম্ভাবনার ধারণার ভিত্তি হওয়া উচিৎ বিশুদ্ধ গাণিতিক সংজ্ঞা, যা থেকে গাণিতিক অপারেশনের মাধ্যমেই সম্ভাবনার মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও চিরায়ত উপপাদ্যগুলো বের করা হবে। 
১৯৩০ এর দশকে কলমোগোরভ, লেভি ও খিনচিন এর মতো গণিতবিদরা সম্ভবানার গাণিতিক রূপায়নের জন্যে কাজ করে যাচ্ছিলেন। ক্র্যামার তাঁদের কাজের প্রতি আকৃষ্ট হন। শুধু তাই নয়, নিজেও অবদানও রাখা শুরু করেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বই ম্যাথেম্যাটিক্যাল মেথডস অব স্ট্যাটিসটিক্স। এ বই থেকেই প্রমাণ হয়, পরিসংখ্যান চর্চা নিতান্তই একটি গাণিতিক বিশ্লেষণ।

ক্র্যামারের বিখ্যাত বই Mathematical Methods of Statistics

১৯২৯ সালে ক্র্যামার স্টোকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রতিষ্ঠিত Actuarial Mathematics and Mathematical Statistics বিভাগের চেয়ারম্যান হন। এ পদে থাকেন ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৫০ সালে অ্যামেরিকান স্ট্যাসটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এর ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৫০ সাল থেকে তিনি স্টোকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও কাজ করতে থাকেন। ১৯৫৮ সালে সুইডেনের সমগ্র ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের আচার্য মনোনীত হন। অবশ্য অবসর নেন ১৯৬১ সালেই।

জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কাটান বিমা বিজ্ঞান (Actuarial science) ও বিমা গণিত নিয়ে কাজ করে করে।

১৯৬১ সালে অবসর গ্রহণের পরে গবেষণার দিকে আরও ভালোভাবে মনোনিবেশ করেন। এভাবেই পার করেন জীবনের শেষ ২০ বছর। এ সময় ইউরোপ ও অ্যামেরিকা জুড়ে ব্যাপক সফর করেন।

১৯৭২ সালে হেরিওট-ওয়াট ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানজনক ডক্টরেট লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে নিজ দেশে পরলোকগমন করেন পরিসংখ্যানের অন্যতম এই 'দৈত্য'। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

সূত্রঃ
১। মৌলিক সংখ্যা নিয়ে পেপার
২। উইকিপিডিয়াঃ হ্যারাল্ড ক্র্যামার
Category: articles

Wednesday, September 13, 2017

লিখেছেনঃ ড. রহমতুল্লাহ ইমন
(লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে ফেসবুক টাইমলাইন থেকে পুনঃপ্রকাশিত)

এলাকাভেদে একটি মূল ভাষার আঞ্চলিক ভাষায় বিভিন্নতা আসতেই পারে। কিন্তু একটি শাস্ত্রের ভাষা কি অঞ্চল ভেদে ভিন্ন হতে পারে? এমন বিরল ঘটনা ঘটেছে পরিসংখ্যানের ভাগ্যে। আপনি যদি অন্যতম প্রধান বাংলাভাষী অঞ্চল ভারতের পশ্চিম বাংলার কোন শিক্ষিত মানুষকে পরিসংখ্যান শব্দটি বলেন তবে নিশ্চিতভাবেই তিনি অবাক বিস্ময়ে আপনার মুখের দিকে চেয়ে রবেন। কেননা শব্দটি তাঁর কাছে খুব একট পরিচিত নয়। খুব অবাক হচ্ছেন তাই তো? কেমন শিক্ষিত লোক যে পরিসংখ্যান শব্দটি শুনেই হোঁচট খাচ্ছে? আচ্ছা, এবার যদি আমি আপনার কাছে রাশিবিজ্ঞান সম্বন্ধে জানতে চাই? আমি নিশ্চিত আপনাদের অনেকেই এবার একে অপরের সাথে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। অনেকেই হয়তো শব্দটি জীবনে প্রথমবারের মত শুনলেন। আর যারা আগে শুনেছেন তারাও খুব স্বস্তি বোধ করছেন না। অথচ শব্দটি পশ্চিম বাংলার কাউকে জিজ্ঞাসা করুন, সবাই বুঝে যাবেন যে এটা Statistics এর পরিভাষা। আমাদের দুই বাংলায় কেন দুটি ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে এটা বুঝতে হলে বাংলায় পরিসংখ্যান চর্চার ইতিহাসটিও জেনে নিতে হবে।

অবিভক্ত ভারতবর্ষে পরিসংখ্যানের পঠন পাঠন প্রথম শুরু হয় কলকাতায়। ঢাকার বিক্রমপুরের কৃতী সন্তান প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিসকে বলা হয় ভারতের পরিসংখ্যানের জনক। পদার্থবিদ্যার ছাত্র মহলানবিস ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা নেবার সময় পরিসংখ্যানের জনক বলে খ্যাত স্যার রোনাল্ড ফিশারের সংস্পর্শে আসেন এবং বিষয়টির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি এই বিষয়টি আয়ত্ত করার জন্য আবারও ইংল্যান্ড যান। দেশে ফিরে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যায় অধ্যাপনা করলেও তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল পরিসংখ্যান। ১৯৩১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পরিসংখ্যান পঠন পাঠন ও গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান Indian Statistical Institute। মহলানবিস Statistics এর বাংলা করেন রাশিবিজ্ঞান এবং এভাবেই নতুন প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় ভারতীয় রাশিবিজ্ঞান সংস্থা।

এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ১৯৩৮ সালে রাশিবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা করেন বাংলাদেশে পরিসংখ্যানের জনক বলে খ্যাত কাজী মোতাহার হোসেন। হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার ছাত্র ছিলেন। এখানে পড়ার সময় তিনি বিশ্বখ্যাত পদার্থবিদ সত্যেন বোসের সংস্পর্শে আসেন। বোস হোসেনকে পরিসংখ্যান পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁরই অনুপ্রেরণায় হোসেন কলকাতায় এসে মহলানবিসের কাছে অধ্যয়ন করেন। ডিপ্লোমা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে পরিসংখ্যান পঠন পাঠনে নতুন একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। এসময় তিনি রাশিবিজ্ঞান শব্দটির পরিবর্তে Statistics এর নতুন বাংলা নামকরণ করেন পরিসংখ্যান। পরবর্তীতে তিনি পরীক্ষণ নকশা (Design of Experiments) এর ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, যার পরীক্ষক ছিলেন স্যার রোনাল্ড ফিশার। স্যার ফিশার হোসেনের শৃঙ্খলবদ্ধ নিয়ম (Hussin’s Chain Rule) এই কাজটি দেখে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে তাঁর প্রশংসা করেছেন এবং মন্তব্য করেছিলেন যে,
হোসেন এমন কিছু কাজ করেছেন যা আমি নিজেও করতে পারতাম না।

প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিস ও কাজী মোতাহার হোসেন শুধু নামকরা পরিসংখ্যানবিদই ছিলেন না, তাঁরা দুজনেই ছিলেন বাংলা ভাষায় সুপণ্ডিত। মহলানবিস ছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সরাসরি ছাত্র এবং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ও বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার বন্ধু। তবে এ ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও হয়তো এগিয়ে ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। নজরুল মোতাহারকে আদর করে বলতেন ‘মোতি হার’। সাহিত্যে হোসেনের দক্ষতা দেখে নজরুল মন্তব্য করেছিলেন যে,
 মোতিহার যদি বিজ্ঞান চর্চা না করে সাহিত্যচর্চা করতেন তাহলে কবি সাহিত্যিকদের ভাত মারা যেত। 

কাজী মোতাহার হোসেন কাজী আব্দুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেন ও আবুল ফজলের সাথে মিলে ১৯২৬ সালে "মুসলিম সাহিত্য সমাজ" গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনি কিছুকাল শিখা নামক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। কাজী মোতাহার হোসেন বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতির উপর অনেক বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে সঞ্চয়ন, নজরুল কাব্য পরিচিতি, সেই পথ লক্ষ্য করে, প্লেটোর সিম্পোজিয়াম, গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস, পরিসংখ্যান শব্দকোষ, আলোক বিজ্ঞান, নির্বাচিত প্রবন্ধ অন্যতম।

বহু প্রতিভার অধিকারী কাজী মোতাহার হোসেন 

বাংলা ভাষার ওপর তাঁর এতটাই দখল ছিল যে তাঁকে বাংলা বানান ও লিপি সংস্কার কমিটির সদস্য করা হয়েছিল। অসাম্প্রদায়িক ধ্যান ধারণায় বিশ্বাসী এবং সেই আলোকে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুদৃঢ় ভিত গড়ে তোলার জন্য তিনি লেখনী পরিচালনা করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবীতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তিনি ছিলেন তার একজন দৃঢ় পৃষ্ঠপোষক। বক্তৃতা, বিবৃতি ও প্রবন্ধাদি প্রকাশ করে এ সব আন্দোলনে গতিদান করেন। ১৯৬১ সালে প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীদের বিরোধিতার মুখে ঢাকায় রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালি সংস্কৃতি খর্ব করার জন্য রেডিও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দাবা খেলোয়াড়। বাংলাদেশে দাবা খেলার পথিকৃৎ হিসেবে তাকে সম্মানিত করা হয়। উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু হিসেবে ১৯২৯ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলা এবং ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত পাকিস্তানে একক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। দাবা খেলায় তার অনন্য অবদানের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের উদ্যোগে কাজী মোতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়।

প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিস Statistics এর বাংলা করেন রাশিবিজ্ঞান। কাজী মোতাহার হোসেন এই অনুবাদটি গ্রহণ করেননি। না, এখানে ব্যক্তিগত বিরোধের কোন অবকাশ ছিল না, বরং তাঁদের পারস্পরিক আন্তরিকতার কথাই ছিল সর্বজনবিদিত। হোসেন ভাবতেন রাশিবিজ্ঞান শব্দটি দিয়ে Statistics কে পরিপূর্ণ ভাবে বোঝানো সম্ভব হয় না। রাশিবিজ্ঞান শব্দটির আক্ষরিক ইংরেজি করলে তা হয় Data Science। Data Science হাল আমলে Statistics এর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু তার ব্যাপ্তি Statistics এর মতো ব্যাপক নয়। আর সেকারণেই হোসেন একটি নতুন বাংলা শব্দের উদ্ভব করেন। পরি+সংখ্যা+অনট(অন) = পরিসংখ্যান অর্থাৎ সংখ্যা সম্পর্কিত বিজ্ঞান।

পরিসংখ্যান শুধুমাত্র সংখ্যা নিয়ে কাজ করে না, কিন্তু যখন বলা হয় সংখ্যা সম্পর্কিত বিজ্ঞান তখন তার ব্যাপ্তি Statistics কে ধারণ করে। যা হোক, আমাদের দুই বাংলায় Statistics এর পরিভাষা হিসেবে রাশিবিজ্ঞান ও পরিসংখ্যান শব্দ দুটির ব্যবহার লক্ষ্য করা গেলেও আন্তর্জাতিক মহলে পরিসংখ্যান শব্দটিই স্বীকৃতি লাভ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান সংস্থা (International Statistical Institute) ২০১০ সালে বিভিন্ন ভাষায় Statistics শব্দটির যে তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে Statistics এর পরিভাষা হিসেবে পরিসংখ্যানকে ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের পশ্চিম বাংলার অনেক বন্ধুকেই আজকাল দেখছি পরিসংখ্যান শব্দটি ব্যবহার করতে। না, শুধুমাত্র বিতর্ক সৃষ্টির জন্য নয়, অর্থের বিচারেই একদিন Statistics এর পরিভাষা হিসেবে পরিসংখ্যান ফিরবে সবার মুখে মুখে।

লেখকঃ অধ্যাপক, ম্যাথেম্যাটিক্যাল সায়েন্সেস,  Ball State University। 
Category: articles

Friday, July 15, 2016

আজ ১৫ জুলাই। ১৯২৪ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত ব্রিটিশ পরিসংখ্যানবিদ ডেভিড কক্স।

পরিসংখ্যান ও প্রায়োগিক সম্ভাবনার বহু ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কোপলে পদক ও পরিসংখ্যানের Guy Medal সহ অনেকগুলো পুরস্কারের মালিক তিনি।

পরিসংখ্যানবিদঃ ডেভিড কক্স 
১৯২৪ সালের ১৫ জুলাই তারিখে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে কক্স ( (David Cox) জন্মগ্রহণ করেন। গণিত নিয়ে পড়াশুনা করেন সেন্ট জোন্স কলেজে। ১৯৪৯ সালে লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময় আরেক পরিসংখ্যানবিদ হেনরি ড্যানিয়েলস ছিলেন তাঁর অন্যতম উপদেষ্টা।

তিনি ১৯৪৪ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত রয়েল বিমান সংস্থায় কাজ করেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ছিলেন লিডসের পশম শিল্প গবেষণা সংস্থায় এবং ১৯৫০ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান পরীক্ষাগারে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনের বার্কবেক কলেজের রিডার ও পরে অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন।

১৯৬৬ সালে তিনি লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের পরিসংখ্যানের প্রধানের পদ গ্রহণ করেন। পরে তিনি গনিত বিভাগের প্রধান হন। ১৯৮৮ সালে তিনি নাফিল্ড কলেজের ওয়ার্ডেন এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এর পরিসংখ্যান বিভাগের সদস্য হন। ১৯৯৪ সালে এসব পদ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন।

পরিসংখ্যান ও প্রায়োগিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে তাঁর বহু অবদানের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল Proportional hazards model। সারভাইভাল বিষয়ক উপাত্ত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই মডেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন, আয়ুষ্কাল বিষয়ক এক মেডিকেল গবেষণায় দেখা যায় যে রোগীর বয়স, খাদ্য অথবা নির্দিষ্ট রসায়নিক দ্রব্যের প্রভাব ইত্যাদি বিভিন্ন তথ্যের সাথে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। এছাড়াও তাঁর নামানুসারেই কক্স প্রসেসের নামকরণ করা হয়েছে।

বিভিন্ন জায়গা থেকে কক্স অসংখ্য সম্মানসূচক ডক্টরেট পেয়েছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৮৭ সালে পাওয়া হেরিওট- ওয়াট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া ডিগ্রি। তাকে রয়েল পরিসংখ্যান সোসাইটির রূপার এবং সোনার “Guy Medels” পদকে ভুষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালে তিনি লন্ডনের রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালে দ্বিতীয় রাণী এলিজাবেথ তাকে নাইট পদে ভূষিত করেন।

২০০০ সালে তিনি ব্রিটিশ একাডেমির সম্মানসূচক ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স এর একজন বৈদেশিক সহযোগী এবং রয়েল ড্যানিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড লেটারস এর একজন বৈদেশিক সদস্য।

১৯৯০ সালে তিনি ক্যান্সার গবেষণা বিষয়ক 'Proportional hazards regression model' এর উন্নতি সাধনের জন্য kettering prize এবং স্বর্ণ পদক পেয়েছিলেন। ২০১০ সালে পরিসংখ্যানের তত্ত্বীয় এবং প্রয়োগিক বিষয়ে তার অসামান্য অবদানের জন্য তিনি রয়েল সোসাইটির কোপলে পদকে ভূষিত হয়েছিলেন।

বর্তমানে বিখ্যাত এমন বহু তরুণ গবেষককে তিনি তত্ত্বাবধান, সহযোগিতা এবং অনুপ্রেরণা দান করেছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন রয়েল পরিসংখ্যান সোসাইটির বারনোউলি সোসাইটি এবং আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ইন্সটিটিউট এর সভাপতি হিসেবে।

তিনি একা বা যৌথভাবে ৩০০টি বই বা গবেষণাপত্র লিখেছেন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি পরিসংখ্যান বিষয়ক বৈজ্ঞানিক জার্নাল Biometrika এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু বই হল Planning of experimentsRenewal TheoryAnalysis of binary dataThe theory of design of experimentsPrinciples of Applied Statistics ইত্যাদি।

১৯৪৭ সালে তিনি জয়েস ড্রুমন্ড এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের চারটি সন্তান এবং দুইটি নাতি- নাতনি আছে। তিনি এখনও বেঁচে আছেন।

সূত্রঃ
১। https://en.m.wikipedia.org/wiki/David_Cox_(statistician)
২। https://en.wikipedia.org/wiki/Henry_Daniels
Category: articles

Saturday, April 16, 2016

আজ ১৬ এপ্রিল। ১৮৯৪ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন পোলিশ গণিত ও পরিসংখ্যানবিদ জার্জি নেইম্যান।


নেইম্যানই সর্বপ্রথম পরিসংখ্যানের হাইপোথিসিস টেস্টিং (test of hypothesis) এর জগতে কনফিডেন্স ইন্টারভাল(confidence interval) এর ধারণা প্রবর্তন করেন। এছাড়াও তিনি ইগন পিয়ারসনের (কার্ল পিয়ারসনের ছেলে) সাথে যৌথভাবে নাল হাইপোথিসিস (null hypothesis) প্রস্তাব করেন।

১৮৯৪ সালে রুশ সাম্রাজ্যের এক পোলিশ ক্যাথলিক খ্রিষ্টান পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা- মায়ের চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলায় গির্জায় যাজকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর পরিবার ছিল খুব উচ্চবংশীয়, পূর্বপুরুষদের অনেকেই সামরিক বাহিনীতে নাম করেছিলেন।

আট বছর বয়স পর্যন্ত পড়াশোনা করেন বাসায় গৃহশিক্ষিকার কাছে। এর পর ভর্তি হন স্থানীয় জিমনেশিয়ামে। এ অল্প বয়সেই তিনি পাঁচ পাঁচটি ভাষায় কথা বলতে শিখেন। এগুলো হল পোলিশ, ইউক্রেনীয়, রুশ, ফরাসী ও জার্মান। ১৯০৯ সালে তিনি জিমনেশিয়ামের গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। ১৯১২ সালে ভর্তি হন ইউক্রেনের খারকোভ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে তিনি রুশ গণিত ও সম্ভাবনাবিদ (probabilist) সের্গেই বার্নস্টাইন এর কাছে পড়ার সুযোগ পান। এখানে থাকা অবস্থায়ই পরিমাপ তত্ত্ব (measure theory) ও সমাকলনের (integration) প্রতি তাঁর তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়।

১৯২১ সালে তিনি তাঁর দেশ পোল্যান্ডে ফিরে আসেন। ১৯২৪ সালে ওয়ারস' বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। এটি পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল 'কৃষি ক্ষেত্রে সম্ভাবনা তত্ত্বের প্রয়োগ'।

তিনি ফেলোশিপ নিয়ে লন্ডন ও প্যারিসে কয়েক বছর সময় কাটান। এখানে এসে গাণিতিক পরিসংখ্যানের জনক কার্ল পিয়ারসন ও এমিলি বোরেলের কাছে পরিসংখ্যান শিখেন। পোল্যান্ড ফিরে এসে একটি বায়োমেট্রিক ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন।

পরীক্ষণ ও পরিসংখ্যান নিয়ে অনেকগুলো বই লেখেন তিনি। বর্তমানে আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) যে প্রক্রিয়ায় ওষুধের গুণাগুণ পরীক্ষা করে সে প্রক্রিয়ার উদ্ভাবক তিনিই।

১৯২৩ সালে তিনি র‍্যান্ডোমাইজড এক্সপেরিমেন্ট এর প্রস্তাব পেশ করেন এবং এ নিয়ে গবেষণা গবেষণা চালিয়ে যান। বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। এর ফলে পরীক্ষণের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে। ১৯৩৪ সালে তিনি রয়েল স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটিতে (Royal Statistical Society) একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র জমা দেন। এতে স্তরীভূত নমুনায়ন (stratified sampling) ও উদ্দেশ্যমূলক বাছাই (Purposive Selection) সম্পর্কে আলোচনা ছিল। এই গবেষণাপত্রই আধুনিক বৈজ্ঞানিক নমুনায়নের (sampling) ভিত্তি তৈরি করে।

১৯৩৭ সালে তিনি কনফিডেন্স ইন্টারভাল সম্পর্কিত তাঁর গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেন। তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল নেইম্যান- পিয়ারসন লেমা, যা হাইপোথিসিস টেস্টিং এর মূল ভিত্তি।

১৯৩৮ সালে চলে আসেন আমেরিকার বার্কলেতে। এখানেই কাটে তাঁর বাকি জীবন। তাঁর অধীনে ৩৭ জন ছাত্র পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি রয়েল স্ট্যাটিস্টিক্যাল সোসাইটির গাই মেডাল লাভ করেন। এর তিন বছর পর পান আমেরিকার ন্যাশনাল সায়েন্স মেডাল। এছাড়াও আরো বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন তিনি।

তিনি ১৯৮১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে পরলোক গমন করেন।

সূত্রঃ
১। https://en.wikipedia.org/wiki/Jerzy_Neyman
২। https://en.wikipedia.org/wiki/Confidence_interval
৩। https://en.wikipedia.org/wiki/Guy_Medal
৪। http://www-history.mcs.st-and.ac.uk/Biographies/Neyman.html
Category: articles